Header top
Dirilis Ertugrul bangla

দিরিলিস আরতুগ্রুল -০৮

উসমানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পেছনে আরতুগরুল গাজির দূরদৃষ্টিসম্পন্নতা এবং তার বীরত্বগাথা জীবনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম । এজন্য তিনি মানিত উসমানি সাম্রাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে এবং আজকের মতাে আগামীতেও তিনি বেঁচে থাকবেন দেশ – বিদেশের বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনায় — স্মৃতির আল্পনা হয়ে ।

আরতুগরুল সমাধি
বর্তমান সুগুত শহরের বাইরে আরতুগরুলের কবর । কবরের ওপর রয়েছে একটি সমাধি । পাশাপাশি একটি গম্বুজ ও মসজিদও রয়েছে । এটি বর্তমানে একটি মাজার বা দরগায় পরিণত হয়েছে । দেশ – বিদেশের অনেক পর্যটক এই মাজার জিয়ারত করতে আসেন । এই কবরটি নির্মাণ করেন উসমান গাজি ; পিতার স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখতে তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি কবরকে খােলামেলা রাখেন । সমাধি , গম্বুজ ও মসজিদ নির্মাণ করেন সুলতান প্রথম মুহাম্মদ । ১৭৫৭ সালে সুলতান তৃতীয় মুস্তফা মাজারের পুনর্নির্মাণ করেন । আর ১৮৮৬ সালে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ এটিতে আবারও করেন পুনর্নির্মাণের কাজ ।

রণতরী আরতুগরুল
১৮৫৪ সালে উসমানি সুলতান প্রথম আবদুল আজিজ আরতুগরুলের নামে একটি ফ্রিগ্যাট বা রণতরী নির্মাণের আদেশ দেন । উসমান গাজির পিতার নাম স্মরণীয় করে রাখতে ইস্তাম্বুলের গােল্ডেন হর্নের উসমানি সামরিক অস্ত্রাগারে কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয় রণতরীটি ।

১৮৬৩ সালের ১৯ অক্টোবর সুলতানের উপস্থিতিতে এটি উদ্বোধন করা হয় । ১৮৮৯ সালের ৬ এপ্রিল উসমানি খেলাফতের নৌ – মন্ত্রণালয় ইস্তাম্বুল থেকে জাপানে কূটনৈতিক সফরের জন্য আলি উসমান বেগকে জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে নিযুক্ত করেন । তিনি ছিলেন নৌ – বিদ্যায় পারদর্শী এবং একাধিক ভিন্ন ভাষায় যােগ্যতার অধিকারী ।

এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের পক্ষ থেকে জাপানের সাথে বন্ধুপ্রতিম সম্পর্ক স্থাপন করা । পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে উসমানি পতাকা প্রদর্শন করা । তত দিনে রণতরী আরতুগরুলের বয়স পঁচিশ পেরিয়ে গিয়েছিল এবং তাতে দেখা দিয়েছিল ভগ্নদশা । জাপান অভিমুখে যাত্রা করার আগে ইস্তাম্বুলে রণতরীর মেরামত করা হয় এবং অনেক পুরনাে জীর্ণ কাঠ পাল্টিয়ে নতুন কাঠ লাগানাে হয় ।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস , ১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক সফর শেষে ফেরার পথে মওসুমি জলবায়ুর কবলে পড়ে তারা । ঝড়ের আঘাতে রণতরী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে । মাল্লা ও নাবিকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও জাহাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি । এভাবে চার দিন সমুদ্রে ভেসে বেড়িয়ে অবশেষে উপকূলে এসে প্রকাণ্ড পাথরের সাথে ধাক্কা খায় এবং অথই জলরাশিতে ডুবে যায় স্মৃতির রণতরী আরতুগরুল ! এতে করে পাঁচশ তেত্রিশ জন মাল্লা ডুবে মারা যান । এদের মধ্যে পঞ্চাশ জনের মতাে ছিলেন ক্যাপ্টেন ।

মারা যান জাহাজের অ্যাডমিরাল আলি উসমান বেগ । মাত্র তেষট্টি জন মাল্লা এবং ছয়জন ক্যাপ্টেন জীবন নিয়ে বাঁচেন । এদেরকে দুটি জাপানি রণতরী উদ্ধার করে ইস্তাম্বুল পৌঁছে দেয় । নিহতদের স্মরণে দক্ষিণ তুরস্কের মারসিন এবং জাপানের কুশিমতাে শহরে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয় । ২০০৭ সালের ৪ জানুয়ারি সমুদ্রের তলদেশ হতে আরতুগরুল রণতরীর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করার কাজ শুরু হয় এবং ২০০৮ সালে ২৮ জানুয়ারি সমুদ্রের তলদেশে রণতরীর বিশেষ অস্ত্রাগারের গুদামঘরে পৌঁছে একটি অনুসন্ধানী দল । তারা কিছু গােলাবারুদ , সামুদ্রিক মাইন , বােমা ও গুলি উদ্ধার করে জাপানের কুশিমতাে নৌবন্দরে নিয়ে আসে ।

সেখানে জাপানের মেরামত – প্রকৌশলী , পুলিশ , সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী এগুলাের যাচাই বাছাই করেন । এরপর সেগুলাে জাপানের আরতুগরুল গবেষণাগারে সংরক্ষিত রাখা হয় । এরপর তুরস্ক ও জাপান রণতরী আরতুগরুলের কাহিনি – সম্বলিত একটি ড্রামা সিরিয়াল নির্মাণের ওপর একমত পােষণ করে এবং কিছু দিন পরই কার্যত ‘ আরতুগরুল ১৮৯০ ‘ নামে একটি ড্রামা সিরিয়াল প্রদর্শন করানাে হয় । সিরিয়ালটি অনেক প্রশংসা কুড়ায় এবং জাপানি একাডেমি থেকে পুরস্কার লাভ করে।

আরতুগরুল মসজিদ , ইস্তাম্বুল

১৮৮৭ সালে উসমানি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বেশিকতাশ এলাকার ইলদিজ মহল্লায় আরতুগরুল নামে একটি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন । মসজিদের সাথে একটি মেহমানখানা , খানকা , মাজার, ফোয়ারা , লাইব্রেরি ও প্রশস্ত আঙিনা নির্মাণ করেন ।

১৯২৫ সালে কামাল পাশার শাসনামলে মসজিদ ও খানকা ভেঙে ফেলা হয় । আর মেহমানখানাকে রূপান্তরিত করা হয় প্রাথমিক স্কুলে । পরবর্তীকালে ২০০৮ সালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুলের আমলে এসব পুরনাে স্থাপনার পুনর্নির্মাণের কাজ করা হয় এবং মসজিদ ও মাজারের উদ্বোধন করা হয় ।

আরতুগরুল মসজিদ , তুর্কমেনিস্তান ।

আরতুগরুলের সম্মানার্থে তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ শহরে একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয় । ১৯৯০ সালে তুর্কমেনিস্তান সােভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুক্তি লাভ করার পর নিজ দেশে ইসলামি পুনর্জাগরণের জন্য যখন পদক্ষেপ গ্রহণ করে , তখন সে ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয় অনেক মসজিদ ; সে সময় আরতুগরুল জামে মসজিদেরও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয় ।

কমিউনিস্ট বলশেভিকরা এসব মসজিদ ধুলিস্যাত করে দিয়েছিল । পুনর্নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ১৯৯৮ সালে পুনরায় আরতুগরুল জামে মসজিদের উদ্বোধন করা হয় ।

আরতুগরুল গাজি জাদুঘর

এটি তুরস্কের বিলেচিক প্রদেশের সুগুত শহরে অবস্থিত । কায়ি গােত্রের জায়গির ও উসমানি সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল এই সুগুত । জাদুঘরটি সুগুতে হলেও আরতুগরুলের মাজার – সংলগ্ন নয় । বিংশ শতাব্দীর শুরুলগ্নে জাদুঘরটি একটি ক্লিনিক ঔষধালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতঃপর ২০০১ সালে আবার সংস্কার করা হয় এবং জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয় ।

দিরিলিস আরতুগরুল

এটি একটি ঐতিহাসিক তুর্কি ড্রামা সিরিয়াল । তুরস্কের টিআরটি -১ টিভি চ্যানেল ২০১৪ থেকে নিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ যাবৎ মােট পাঁচটি সিজনে সিরিয়ালটি প্রদর্শন করেছে । এ সিরিয়ালের ঐতিহাসিক কাহিনিগুলাে ঘটেছে ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে । এতে অঘুজ তুর্কি বংশ , কায়ি গােত্র , সুলায়মান শাহ , আরতুগরুল গাজি ও উসমান গাজিকে দৃশ্যায়িত করা হয়েছে ।

এককথায় সিরিয়ালে উসমানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট , প্রাথমিক ইতিহাস ও ঘটনাবলি চিত্রিত করা হয়েছে । সিরিয়ালটি নির্মাণ করেছেন প্রসিদ্ধ তুর্কি নির্মাতা মেহমেত বােজদাগ ও কেমাল তেকদেন । আরতুগরুলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এনজিন আলতান দোজায়তান ।

সিরিয়ালটি সারা বিশ্বে তুমুল আলােড়ন সৃষ্টি করেছে । বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ডাবিং করে এর সম্প্রচার হয়েছে ; বিশেষ করে আরবভূমিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সিরিয়ালটি । বাংলাদেশের মাছরাঙা টেলিভিশনও ডাবিং করে সম্প্রচার করেছে এর প্রথম দুইটি সিজন ; সীমান্তের সুলতান ’ নামে একুশে টেলিভিশনেও কিছু দিন পর্যন্ত এর সম্প্রচার চালু ছিল ; এ ছাড়াও বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ — যেমন : আযমী পথিক , অনুবাদ আর্তুগ্রুল ইত্যাদি এর বাংলা সাবটাইটেল করেছে ।

এর ভক্ত ও অনুরাগীর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে । এ যাবৎ ষাট মিলিয়নেরও বেশি দর্শক সিরিয়ালটি দেখেছেন । সিরিয়ালটি ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বেশ বিতর্কেরও জন্ম । দিয়েছে । তুরস্ক ও বিশ্বের প্রায় সব দেশেই একচেটিয়া জনপ্রিয়তা লাভ করলেও আরব – দেশের সচেতন বাসিন্দা ও তুর্কি ইতিহাস – গবেষকরা এর সমালােচনায় মুখর ।

তাদের ভাষ্য , সিরিয়ালের কাল্পনিক দৃশ্য ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় মিল নেই । তা ছাড়া , তুর্কিরা আরবদের থেকে ইসলামের জন্য অধিক নিবেদিতপ্রাণ , এই ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সিরিয়ালটিকে কপােলকল্পনার একটি চলতি – আয়ােজন বানিয়ে ফেলা হয়েছে — এমন ভাষ্যও ফুটে উঠেছে কোনাে কোনাে বিশ্লেষকদের মতে ! পরন্তু এই সিরিয়ালটির জের ধরে আরব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদের পুরনাে বিবাদ ও এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও বিশ্লেষকদের টেবিল থেকে – যে নেটিজেনদের ডিভাইসে ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়েছে , সেটিও এখন খুল্লামখুলা বাস্তবতা !

আরব বাসিন্দা ছাড়াও তুর্কি গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যেও সিরিয়ালটির সমালােচকের সংখ্যা কম নয় ; বিশেষ করে কামাল পাশার সমর্থকগােষ্ঠী এর সমালােচনায় একটু বেশিই মুখর ।
তবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান অভিনেতাদের প্রশংসা ও সিরিয়ালটি পছন্দ করে বলেছেন- “ তােমরা মানুষের অন্তর জয় করতে পেরেছ ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button